মস্তিস্ক মানব স্নায়ুতন্ত্রের কেন্দ্রীয় অঙ্গ । এটি সুষুম্নাকাণ্ডের সাথে মিলে মানবদেহের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র গঠন করেছে। মানুষের মস্তিষ্ক গুরুমস্তিষ্ক, মস্তিষ্ককাণ্ড ও লঘুমস্তিষ্ক নামক তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত। মস্তিষ্ক মানবদেহের সিংহভাগ কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এই উদ্দেশ্যে মস্তিষ্ক সংজ্ঞাবহ স্নায়ুতন্ত্র বা জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলি থেকে তথ্য সংগ্রহ করে, সেগুলির প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পন্ন করে, প্রক্রিয়াজাত তথ্যগুলির সমবায় ও সমন্বয় সাধন করে এবং এর প্রত্যুত্তরে মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ বা তন্ত্রে স্নায়ুকেন্দ্র থেকে কী ধরনের নির্দেশাবলি স্নায়বিক সমন্বয়যুক্ত অঙ্গে বা তন্ত্রে পাঠানো হবে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। নরম উপাদানে গঠিত মস্তিষ্ক মানুষের মাথাতে (মানবমস্তক) খুলির হাড়গুলির ভেতরে সুরক্ষিত অবস্থায় থাকে।

বিবর্তনের ধাপগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক যত উন্নত হয়েছে সেরেব্রাম তত বড় হয়েছে | বা উল্টো করেও বলা যায় যে সেরেব্রাম যত বড় হয়েছে মস্তিষ্ক তত উন্নত হয়েছে | এই বড় আকারের সেরেব্রামের দরকার হয়েছে উন্নত ও জটিল কার্য সম্পন্ন করার জন্য, যেমন কথা বলা, স্মৃতি ধারণ, তথ্য সংশ্লেষণ ইত্যাদি | খুব ছোট এবং সরল শারীরবৃত্তীয় গঠনের যেসব প্রাণী তাদের ব্রেইন তো দূরের কথা, কেন্দ্রীয় কোনো স্নায়ুতন্ত্রও থাকেনা | তাদের স্নায়ুতন্ত্র বলতে যা থাকে তা হলো মানুষের হাঁটু ঝাঁকুনির মতো অতি সরল কিছু  in-built ” রিফ্লেক্স পাথ” এর নেটওয়ার্ক | উদাহরণ হিসাবে চ্যাপ্টাকৃমি বা নিম্নশ্রেনীর অমেরুদণ্ডি প্রানিদের কথা বলা যায় | এদের সারা শরীরে আছে এলেমেলোভাবে সংলগ্ন আর অনির্দিষ্টভাবে সংযুক্ত কিছু নিউরনের সরল নেটওয়ার্ক | কিছু কিছু অমেরুদণ্ডি প্রাণী যেমন চিংড়ি মাছেদের সামান্য উন্নত ব্যবস্থা থাকে | এদের সারা শরীরকে কয়েকটি প্রধান কাল্পনিক অংশে বিভক্ত করে (ছবিটা দেখলে আরো পরিষ্কার হবে), প্রত্যেকটা অংশের জন্য নিযুক্ত থাকে গুচ্ছাকারে সন্নিবিষ্ট কিছু “নিউরোনাল সেল বডি” র বিন্যাস | এই গুচ্ছাকার বিন্যাসকে বলা হয় গ্যাংলিয়া | প্রত্যেকটা গ্যাংলিয়া, তার সংশ্লিষ্ট অংশের নিউরাল নেটওয়ার্ককে পরিচালনা করে | গ্যাংলিয়াগুলোর একে অন্যের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই | এদের থেকে উন্নততর প্রাণীদের এই গ্যাংলিয়াগুলো পরস্পর যোগাযোগ তৈরী করে উদ্ভব করেছে সরল মস্তিষ্কের |

গুরুমস্তিষ্ক মানব মস্তিষ্কের বৃহত্তম অংশ। এটি দুইটি মস্তিষ্ক গোলার্ধে বিভক্ত। গুরুমস্তিষ্কের বহিঃস্তর ধূসর পদার্থ দিয়ে গঠিত এবং এটি শ্বেত পদার্থ দিয়ে গঠিত একটি মজ্জাকে ঘিরে রেখেছে। বহিঃস্তরটিকে নবমস্তিষ্ক বহিঃস্তর এবং অপেক্ষাকৃত অনেক ছোট আদিমস্তিষ্ক বহিঃস্তর – এই দুইটি ভাগে ভাগ করা যায়। নবমস্তিষ্ক বহিঃস্তরটি ছয়টি স্নায়ুকোষীয় স্তর নিয়ে গঠিত, অন্যদিকে আদিমস্তিষ্ক বহিঃস্তরটিতে তিন বা চারটি স্তর থাকে। প্রতিটি মস্তিষ্ক গোলার্ধকে চিরায়তভাবে চারটি খণ্ডকে ভাগ করা হয় – ললাটীয় খণ্ডক, রগাঞ্চলীয় খণ্ডক, পার্শ্বকরোটি খণ্ডক এবং পশ্চাৎকরোটি খণ্ডক। ললাটীয় খণ্ডকটি নির্বাহী কার্যকলাপ যেমন আত্ম-নিয়ন্ত্রণ, পরিকল্পনা,  যুক্তিপাত ও বিমূর্ত চিন্তার সাথে সংশ্লিষ্ট। অন্যদিকে পশ্চাৎকরোটি খণ্ডকটি বীক্ষণের (অর্থাৎ দর্শন বা দেখা) কাজে নিয়োজিত। বহিঃস্তরীয় প্রতিটি খণ্ডকে বিভিন্ন এলাকা থাকে যেগুলি বিশেষ বিশেষ কাজের সাথে সম্পর্কিত। যেমন সংবেদী বহিঃস্তর, চেষ্টীয় বহিঃস্তর এবং সংযুক্তি অঞ্চলসমূহ। যদিও ডান ও বাম মস্তিষ্ক গোলার্ধগুলি আকৃতি ও কাজে মোটামুটি একই রকম, কিছু কিছু কাজ একটি মাত্র গোলার্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট, যাকে মস্তিষ্ককার্যের পার্শ্বীভবন বলে। যেমন ভাষা  বাম মস্তিষ্ক এবং স্থানিক দৃষ্টিক্ষমতা ডান মস্তিষ্কের সাথে সম্পর্কিত। গোলার্ধগুলি করোটিসন্ধি তন্তু দ্বারা একে অপরের সাথে সংযুক্ত থাকে; এদের মধ্যে বৃহত্তমটিকে গুরুমস্তিষ্ক যোজক বলে।

গুরুমস্তিষ্ক মস্তিষ্ককাণ্ডের মাধ্যমে সুষুম্নাকান্ডের সাথে সংযুক্ত থাকে। মস্তিষ্ককাণ্ডটি মধ্যমস্তিষ্ক, লঘুমস্তিষ্ক যোজক এবং সুষুম্নাশীর্ষক নিয়ে গঠিত। লঘুমস্তিষ্ক মস্তিষ্ককাণ্ডের সাথে একজোড়া লঘুমস্তিষ্ক বৃন্তদন্তের মাধ্যমে যুক্ত থাকে। গুরুমস্তিষ্কের ভেতরে মস্তিষ্কগহ্বর ব্যবস্থা অবস্থিত, যাতে চারটি পরস্পর-সংযুক্ত মস্তিষ্কগহ্বর থাকে। এই গহ্বরগুলির ভেতরে মস্তিষ্ক-সুষুম্না তরল উৎপাদিত হয় ও চলাচল করে। গুরুমস্তিষ্ক বহিঃস্তরের নিচে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো বা অঙ্গ অবস্থিত, যাদের মধ্যে (আন্তরমস্তিষ্ক) কক্ষ (থ্যালামাস), অধিকক্ষ (এপিথ্যালামাস), অবকক্ষ (হাইপোথ্যালামাস), অধোকক্ষ (সাবথ্যালামাস), পিনিয়াল গ্রন্থি ও পিটুইটারি গ্রন্থি উল্লেখযোগ্য। আরও আছে প্রান্তীয় কাঠামোসমূহ, যাদের মধ্যে বাদামাকৃতি কেন্দ্র (অ্যামিগডালা) ও সমুদ্রঘোড়াকৃতি কেন্দ্র (হিপোক্যাম্পাস); বেষ্টকেন্দ্র (ক্লস্ট্রাম), মস্তিষ্কতলীয় স্নায়ুগ্রন্থিগুলির বিভিন্ন কোষকেন্দ্র; সম্মুখমস্তিষ্কতলীয় কাঠামোসমূহ এবং তিনটি গহ্বরবেষ্টনকারী অঙ্গ। মস্তিষ্কের কোষগুলির মধ্যে আছে স্নায়ুকোষ (নিউরন) এবং এগুলিকে সমর্থনকারী স্নায়ুধারকোষ (গ্লিয়া কোষ)। মানব মস্তিষ্কে ৮ হাজার ৬ শত কোটিরও বেশি স্নায়ুকোষ আছে এবং একই সংখ্যক বা তারও বেশি সংখ্যক অন্যান্য কোষ আছে। স্নায়ুকোষগুলি একে অপরের সাথে সংযুক্ত থাকে এবং স্নায়বিক উদ্দীপনার প্রত্যুত্তরে স্নায়ুপ্রেরক নামের পদার্থ নিঃসরণ করে, ফলে মস্তিষ্ক তার কার্যাবলি সম্পাদন করতে পারে। স্নায়ুকোষগুলি স্নায়ুপথ ও বর্তনীর সমন্বয়ে একটি বিস্তৃত স্নায়বিক জালিকাব্যবস্থা গঠন করে। এই পুরো বর্তনীব্যবস্থাটি স্নায়ুপ্রেরণ প্রক্রিয়ার দ্বারা চালিত হয়।
মস্তিষ্ককে মাথার খুলি সুরক্ষা প্রদান করে। এটি মস্তিষ্ক-সুষুম্না তরলের মধ্যে নিমজ্জিত থাকে। এটি রক্ত-মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধকের দ্বারা রক্ত সংবহন তন্ত্র থেকে পৃথক থাকে। তা সত্ত্বেও মস্তিষ্কের ক্ষতি, রোগব্যাধি বা জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। মাথায় চোট লেগে বা সন্ন্যাসরোগ (হঠাৎ রক্তের সরবরাহ বন্ধ হওয়া তথা “স্ট্রোক” হওয়া) হয়ে মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া মস্তিষ্কে পার্কিনসনের ব্যাধি, চিত্তভ্রংশ যেমন আলজাইমারের ব্যাধি এবং বহুল কঠিনীভবন (মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস) জাতীয় অবক্ষয়মূলক ব্যাধি হতে পারে। কিছু মানসিক ব্যাধি, যেমন চিত্তভ্রংশী বাতুলতা এবং গুরুতর বিষন্নতাজনিত ব্যাধি মস্তিষ্কের কার্যবিকৃতির সাথে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয়। এর বাইরে মস্তিষ্কে নির্দোষ ও সংহারক উভয় ধরনের অর্বুদ (টিউমার) হতে পারে। সংহারক বা প্রাণঘাতী অর্বুদগুলি সাধারণত মানবদেহের অন্যান্য স্থান থেকে উৎপত্তি লাভ করে।
মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের চিত্র যেসব প্রাণীর ব্রেইন আছে তাদের ব্রেইনের নিম্নোক্ত অংশগুলো থাকবেই : ব্রেইন স্টেম(Brain Stem) : মেডুলা(Medulla), পনস(Pons), মিড-ব্রেইন(Mid Brain) নিয়ে তৈরী অংশটাকে বলা হয় ব্রেইন স্টেম | মেডুলাটা আদতে হলো সুষুম্নাকান্ডের অপরের ভাগের স্ফিত অংশমাত্র | নিম্নপ্রজাতির প্রাণীর ক্ষেত্রে অবশ্য পনস বা মিড ব্রেইন থাকেনা | ব্রেইন স্টেম মূলত রিফ্লেক্স একশন অর্থাৎ প্রতিবর্ত ক্রিয়া, বিভিন্ন ধরনের স্বয়ংক্রিয় কাজ (হৃদস্পন্দনের হার, রক্তচাপ), বিভিন্ন প্রত্যঙ্গের সঞ্চালন, আন্ত্রিক কার্যকলাপ (হজম, মুত্রত্যাগ) পরিচালনা করে | সেরেবেলাম(Cerebellum) : অবস্থান, দিক, মাত্র ইত্যাদি সম্পর্কিত তথ্য এনালিসিস করে প্রাণীর ভারসাম্য বজায় রাখতে তথা অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সঠিক সঞ্চালনা পরিচালনা করে | হাইপোথ্যালামাস(Hypothalamus) আর পিটুইটারি গ্ল্যান্ড(Pituitary Gland) : এরা অন্ত্রের কার্য, শরীরের তাপমাত্রা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে | এছাড়া বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারগত আচরণও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, যেমন: খাদ্যগ্রহণ, পানীয়গ্রহণ, যৌনতা, আগ্রাসী মনোভাব, আনন্দ | সেরেব্রাম(Cerebrum) : একে সেরেব্রাল কর্টেক্স বা শুধু কর্টেক্সও বলা হয় | ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এই অংশের কাজ হলো শরীরের ইন্দ্রিয়গুলো থেকে তথ্য আহরণ করে সেই অনুযায়ী মোটর নিউরনগুলোর কাজের সূত্রপাত ঘটানো, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, স্মৃতি-ধারণ এবং চিন্তাশক্তি নামক জটিল প্রক্রিয়ার পরিচালন | আশ্চর্যরকমের একটা প্রক্রিয়া হলো এই ‘চিন্তা’ | কিভাবে এই প্রক্রিয়াটা সংঘটিত হয় মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে ? দেখা যাক | নিম্নশ্রেনীর প্রাণীরা, যেমন সরীসৃপ, পাখি, উভচর, জলচর; এরা প্রতিদিনের জীবনে অনেক আপাত জটিল কাজ করে থাকে | খাদ্য আহরণ, প্রজনন, ঘুমানো, আত্মরক্ষা ইত্যাদি | কিন্তু এই গুলো এরা কিন্তু সচেতন ভাবে করেনা | এগুলো এদের instinct বা প্রবৃত্তি | এবং এইসব প্রবৃত্তি মানুষের মধ্যেও স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যমান; কারণ মানুষ ও প্রাণী | কিন্তু ভাবনা, চিন্তা, গবেষণা এইসব প্রক্রিয়াগুলোর জন্ম মস্তিষ্কের কোন রহস্যময় অঞ্চলে ? সেটা জানার জন্য আগে জেনে নেই যে দৈনন্দিন এইসব প্রবৃত্তিমূলক কাজ (instinctual process) প্রানীদের দিয়ে করিয়ে নেয় মস্তিষ্কের কোন অঞ্চলগুলো | মস্তিষ্কের নিম্নভাগ
মস্তিষ্কের নিম্নভাগের ভেতরের ছবি প্রথমেই আসা যাক মস্তিষ্কের নিম্নাঞ্চলের দিকে | মেডুলা(Medulla) : মস্তিষ্কের অভিযোজনের প্রথম থেকেই থাকা এই অংশটি রক্তের চাপ, নিঃশ্বাস ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে | এছাড়া বিভিন্ন সংবেদী অঙ্গ থেকে আসা সংকেতগুলো মস্তিষ্কের উর্ধাংশে সংবহন করতে সাহায্য করে | পনস(Pons) : এটি চলন এবং অবস্থান সম্পর্কিত সংকেতগুলো সেরিবেলাম থেকে কর্টেক্স এ বহন করে | এছাড়াও শ্বাস-প্রশ্বাস, স্বাদগ্রহণ, নিদ্রা এইসব কাজগুলো পরিচালনাতে সাহায্য করে | মিডব্রেইন(Mid Brain) : এই অংশটি মস্তিষ্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য অংশগুলোকে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ রাখতে সাহায্য করে | এছাড়াও এটি চোখের নড়াচড়া, শ্রবণ সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে | এর মধ্যে একটা অংশ থাকে যার নাম সাবট্যানশিয়া নিগ্রা (Subtantia Nigra) | এটি কোনকারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নড়াচড়াতে কাঁপুনি চলে আসে | তখন সেটাকে পার্কিস্ন্সনস ডিজিজ বলে | বিখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী এই রোগের শিকার | থ্যালামাস(Thalamus) : বিভিন্ন সংবেদী অঙ্গ থেকে আসা সংকেতগুলোকে গ্রহণ করে বিচার করে যে ওই সংকেতগুলোর কোনটা কর্টেক্স এর কোন অঞ্চলে যাওয়া উচিত | সেই অনুসারে তাদের ঠিক ঠিক জায়গাতে পৌঁছাতে সাহায্য করে | হাইপথ্যালামাস(Hypothalamus) : এই অংশটি পিটুইটারি গ্রন্থির হরমোন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে | আর পিটুইটারি থেকে নিঃসৃত হরমোন যৌন প্রজনন, খাদ্য/পানীয় গ্রহণ, বৃদ্ধি, স্তন্যপায়ীদের দুধ তৈরী ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে | এছাড়া হাইপথালামাসের আরেকটি ভীষণ জরুরি কাজ হলো ব্যবহার বা আচার আচরণ নিয়ন্ত্রণ | এমনকি শরীরের যে Biological Clock থাকে; যার কারণে দিন-রাত্রের আলো ও আঁধারের প্রভাবে প্রাণীরা ঘুমায় ও জাগে সেটাকেও নিয়ন্ত্রণ করে এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ অংশটি | ভারসাম্য রক্ষায় মস্তিষ্ক
কানের ভেতরের অংশ, বিশেষ একটা নার্ভ ও মস্তিষ্কের কিছু অংশ কে একত্রে ভেস্টিবিউলার সিস্টেম বলে |ভেস্টিবিউলার সিস্টেম মানুষের দৈহিক অবস্থান বজায় রাখতে সাহায্য করে | এই অংশগুলোর মধ্যে আলাদা করে সেরেবেলাম সম্পর্কে একটু না বললেই নয় | কারণ প্রানিদেহের ভারসাম্য রক্ষার মতো অসাধারণ ও জটিল কাজটি সুসম্পন্ন করে এ | একে চলতি কথায় ইংরেজিতে Little Brain বলা হয় | এরকম নামকরণের কারণ এটি মস্তিষ্কের ২য় বৃহত্তম অংশ এবং মূল মস্তিষ্কের মতই এর মধ্যেও অনেক ভাঁজ ও খাঁজ থাকে | সুষুম্নাকান্ড থেকে আসা সংবেদী সংকেত, কর্টেক্স/বেসাল গ্যাংলিয়া থেকে মোটর ইনপুট, ভেস্টিবিউলার সিস্টেম থেকে থেকে আসা অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য; এই সমস্ত কিছু আহরণ করে প্রানিদেহের ভারসাম্য রাখার বা পারিপার্শ্বিকের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অঙ্গ প্রত্যঙ্গের নড়াচড়া করানোর প্রক্রিয়াটা সুসম্পন্ন করে থাকে | ধরা যাক, আমরা আমাদের সামনের কম্পিউটারের মনিটরটা ছুঁতে চাইছি | খুব সুন্দর ভাবে ছুঁয়ে ফেলতে পারি আমরা সেটা | চোখ থেকে এবং ভেস্টিবিউলার সিস্টেম থেকে পাওয়া তথ্য গুলো আহরণ করে মস্তিষ্ক এমনভাবে আদেশ দেয় হাতের পেশীকে কে খুব মসৃনভাবে হাতটা এগিয়ে গিয়ে ছুঁয়ে ফেলে মনিটরটাকে | কোনো কারণে সেরেবেলাম ক্ষতিগ্রস্ত হলে হাতের মোশনটা আর মসৃন থাকতনা; কেঁপে কেঁপে এগোত | কারণ তখন কর্টেক্স হাতের পেশীকে কাটা কাটা আদেশ পাঠাত মনিটরের দিকে এগোনোর জন্য | ওই কাটা কাটা আদেশগুলোকে মসৃন করার কাজটাও সেরেবেলাম করে | এছাড়াও মানুষের ভাষার মসৃনতাও রক্ষা করে সেরেবেলাম | কারণ শব্দ উচ্চারণ করার জন্য ঠোঁটের এবং গলার পেশীর নিঁখুত চলনের প্রয়োজন হয় | মস্তিষ্কের উপরের দিকের গঠন
এবার দেখা যাক মস্তিষ্কের উপরের দিকের গঠন |
প্রস্থচ্ছেদে মস্তিষ্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশের অবস্থান অপরের অংশটাকে বলা হয় সেরেব্রাল কর্টেক্স | এটি মস্তিষ্কের সর্ববৃহৎ অংশ | এর বহির্ভাগ তৈরী গ্রে ম্যাটার (Grey Matter) দিয়ে আর অন্তর্ভাগ তৈরী হোয়াইট ম্যাটার (White Matter) দিয়ে | মস্তিষ্কের ক্ষেত্রফল মোটামুটি ২৩৩ থেকে ৪৬৫ বর্গইঞ্চির মধ্যে অর্থাৎ খবরের কাগজের ১টা থেকে ২টা পাতা পাতলে যতটা জায়গা নেবে | করোটি বা খুলির ঐটুকু জায়গার মধ্যে তাহলে কি করে থাকে পুরো মস্তিষ্ক ? স্থান সংকুলানের জন্য তাই কর্টেক্স কুঁচকে-মুঁচকে থাকে | সঙ্গত কারণেই তাই কর্টেক্স এ প্রচুর ভাঁজ অর্থাৎ fold ও খাঁজ অর্থাৎ groove থাকে | এই ভাঁজগুলোকে জাইরি(Gyri) এবং খাঁজগুলোকে সালসি(Sulci) বলে | এরকম কয়েকটা বড় বড় খাঁজ (Sulci) দিয়ে পুরো সেরেব্রাল কর্টেক্সটা কয়েকটি প্রধান অংশে ভাগ করা | এই ভাগ গুলোর আলাদা আলাদা কাজ আছে | সর্বোপরি, একটা বড় খাঁজ দিয়ে পুরো মস্তিষ্কটা দুটো আলাদা প্রধান ভাগ বা গোলার্ধে বিভক্ত করা | যদি মাথার ঠিক ওপর থেকে দেখা যেত তাহলে এই ব্যাপারটা পরিষ্কার দেখা যায় | এই দুটো গোলার্ধের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে কর্পাস ক্যালোসাম (Corpus Callosum) নামের একটা অংশ, যেটা তৈরী হোয়াইট ম্যাটার দিয়ে | যেমন ভাবে কোনো বাড়ির ভেতরে ইলেকট্রিক্যাল ওয়্যারিং করা থাকে ঠিক তেমনি ভাবে মস্তিষ্কের এই সমস্ত অংশও সংযুক্ত থাকে সংকেত আদান প্রদানের জন্য | পার্থক্য এটাই যে, এইক্ষেত্রে সংযোগ রক্ষা করে নিউরনগুলো | বড় বড় খাঁজ দিয়ে মস্তিষ্কের যে বিভিন্ন অঞ্চল বিভক্ত হয়েছে, সেগুলোর কাজ ও গঠন সম্পর্কে একটু জানা যাক:
বিভিন্ন lobe এর অবস্থান প্যারাইটাল লোব(Parietal Lobe) : সুষুম্নাকান্ড থেকে আসা নিউরন সমৃদ্ধ প্রচুর তন্তুর মতো জিনিস হাইপোথ্যালামাসের মধ্যে দিয়ে ঢুকে প্যারাইটাল লোব এর বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্ত থাকে | এরা শরীরের বিভিন্ন অংশের বহিঃত্বকের ” ম্যাপ ” গঠন করে | এই ম্যাপের সাহায্যেই এই প্যারাইটাল লোব বহিঃত্বক থেকে আসা চাপ, স্পর্শ, ব্যথা ইত্যাদি সংবেদন সংশ্লেষ করে এবং সেই অনুযায়ী শরীরের বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট অঙ্গগুলোকে আদেশ প্রদান করে | প্যারাইটাল লোব এর পেছনের দিকে ওয়ের্নিকেস এরিয়া (Wernicke’s Area) | ভাষা সংক্রান্ত শ্রবণ-দর্শন সংকেত সংশ্লেষণে এর গুরুত্ব অপরিসীম | এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেনসরি এফেসিয়া (Sensory Aphasia) নামের রোগ হয় | এই রোগগ্রস্থ ব্যক্তি ভাষা বুঝতে পারেনা কিন্তু দুর্বোধ্য শব্দ উচ্চারণ করতে পারে মুখে | ফ্রন্টাল লোব (Frontal Lobe) : এই অংশটি মানুষের চিন্তা, বোধ, মনন ইত্যাদি জিনিসগুলো নিয়ন্ত্রণ করে | চলন, গমন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নড়াচড়া ইত্যাদি কাজগুলোকে বলা হয় মোটর ফাংশন (Motor Function) | এই মোটর ফাংশন নিয়ন্ত্রণ করে ফ্রন্টাল লোবের একদম পেছনের দিকে অর্থাৎ প্যারাইটাল লোব এর সীমানার কাছে থাকা মোটর সেন্টার(Motor Center) | প্যারাইটাল লোব এর সোমাটোসেনসরি (SomatoSensory) অংশ থেকে মোটর সংকেত আহরণ করে ফ্রন্টাল লোব এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মোটর ফাংশনের সূচনা করে | এর মধ্যেও শরীরের বিভিন্ন অংশের মোটর ম্যাপ থাকে | ফ্রন্টাল লোবের বাম দিকে ব্রোকাস এরিয়া (Broca’s Area) বলে একটা অংশ থাকে | এটি ভাষা বা শব্দ উচ্চারণের জন্য প্রয়োজনীয় মোটর ফাংশন নিয়ন্ত্রণ করে | কোনো মানুষের এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে মোটর এফেসিয়া (Motor Aphasia) রোগ হয় | এই রোগ হলে সেনসরি এফেসিয়া রোগের ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটে | এতে মানুষটি ভাষা বা শব্দ বুঝতে পারে ঠিকই কিন্তু কোনো শব্দ উপযুক্ত কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারেনা | অক্সিপিটাল লোব(Occipital Lobe) : এই অংশটি চোখ থেকে আসা দৃশ্য-সংকেতকে সরাসরি গ্রহণ ও সংশ্লেষ করে | এই সংকেতকে এরপর প্যারাইটাল লোব এর ওয়ের্নিকেস এরিয়া আর ফ্রন্টাল লোব এর মোটর সেন্টারে সংযুক্ত করে | আরেকটা যে জরুরি কাজ এটা করে; রেটিনার ওপর বাইরের জগতের যে উল্টো ছবি পড়ে সেটাকে ঠিকঠাক করার কাজ | টেম্পোরাল লোব(Temporal Lobe) : অক্সিপিটাল লোব এর কাজের সাথে এর মিল আছে | এটি কান থেকে শব্দ-সংকেত গ্রহণ করে সংযুক্ত করে প্যারাইটাল লোব এর ওয়ের্নিকেস এরিয়া আর ফ্রন্টাল লোব এর মোটর সেন্টারে | টেম্পোরাল লোবের ভেতরে থাকা বেসাল গ্যাংলিয়া (Basal Ganglia) নামের অংশটি সেরিবেলামের সাথে একসাথে কাজ করে শরীরের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম সঞ্চালনকে (যেমন আঙ্গুলের ডগা দিয়ে কিছু ছোঁয়া) পরিচালনা করে | এর ভেতরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো লিম্বিক সিস্টেম (Limbic System) | সিন্গুলেট জাইরাস(Cingulate Gyrus), কর্পাস ক্যালোসাম(Corpus Callosum), ম্যামিলারী বডি(Mammillary Body), অলফ্যাক্টরি ট্র্যাক্ট(Olfactory Tract), এমিগডালা(Amygdala) এবং হিপ্পোক্যাম্পাস(Hippocampus) অংশ গুলোকে একত্রে লিম্বিক সিস্টেম বলা হয় | মানুষের স্বল্পস্থায়ী স্মৃতি পরিচালনা করে হিপ্পোক্যাম্পাস| এমিগডালা মানুষের সামাজিক ও যৌন আচরণ এবং অন্যান্য আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে | ইনসুলা(Insula) নামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আছে যেটি ব্রেইন স্টেম এর স্বয়ংক্রিয় কাজগুলোর ওপর প্রভাব সৃষ্টি করে | উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, যখন আমরা কোনো কারণে নিজে থেকেই নিঃশ্বাস বন্ধ করি তখন ইনসুলা থেকে সংকেত প্রবাহ গিয়ে মেডুলার শ্বাস কেন্দ্রকে চাপা দিয়ে দেয় | এছাড়া ইনসুলা স্বাদ-সংকেতও সংশ্লেষ করে | এটি টেম্পোরাল আর ফ্রন্টাল লোবকেও আলাদা করে |
মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের কাজ সুরক্ষা ব্যবস্থা
এবার এই জটিল এবং উন্নত প্রসেসিং সিস্টেম টা চোট-আঘাত থেকে বাঁচানোর জন্য কি ব্যবস্থা আছে শরীরে সেটা একটু দেখা যাক |
মস্তিষ্কের সুরক্ষা ব্যবস্থা আমাদের মস্তিষ্ক এবং সুষুম্নাকান্ড ঢাকা থাকে মেনিনজেস(Meninges) নামের সহনশীল একধরনের পর্দাসদৃশ আবরণ দিয়ে, যাতে ঐসব গুরুত্বপূর্ণ এবং অতি নরম অঙ্গ গুলো মেরুদন্ডের হাড় বা খুলির শক্ত আবরণের সাথে ঘষা থেকে বাঁচে | এই সুরক্ষা অধিকতর নিশ্চিত করার জন্য খুলি ও সুষুম্নাকান্ডের ভেতরটা সেরিব্রো-স্পাইনাল ফ্লুইড(CerebroSpinal Fluid) দিয়ে পূর্ণ থাকে | ঘিলু ও সুষুম্নাকাণ্ড আসলে ওই ফ্লুইডের মধ্যে ভাসতে থাকে | এই সুরক্ষা তরলটি নিরন্তর তৈরী হতে থাকে মস্তিষ্কের মধ্যে থাকা করোয়েড প্লেক্সাস টিস্যু (Choroid Plexus Tissue) দ্বারা | তৈরী হয়ে এটি মস্তিষ্ক এবং সুষুম্নাকান্ডের মাঝের বিভিন্ন ফাঁকফোকর বেয়ে নামতে থাকে যথাযথ জায়গায় পৌঁছানোর জন্য | এই সেরিব্রো-স্পাইনাল ফ্লুইড কে রক্তের সাথে মিশে যাওয়া থেকে বিরত রাখে ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার(Blood Brain Barrier)|
মানুষ অন্যান্য যেকোনো প্রাণীর তুলনায় দুর্বল হওয়া সত্বেও লক্ষ কোটি বছর ধরে তৈরী হওয়া এই অত্যাশ্চর্য তন্ত্রটিই মানুষকে করে তুলেছে সমগ্র প্রাণীজগতের শাসক | এরপরের টিউনে আমরা জানব পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে এই মস্তিষ্ক তথা চিন্তা ভাবনা কিভাবে আলাদা হয়ে যায় | কিভাবে একই গঠনের মস্তিষ্ক আলাদা আলাদা রকম ভাবে চালনা করে পুরুষ-নারীকে | কি করে ভ্রুনকে গড়ে তোলে আলাদা দুটো যৌন অবয়ব হিসাবে |

মস্তিষ্কের শারীরস্থান বিষয়ক গবেষণাক্ষেত্রকে স্নায়ুশারীরস্থানবিজ্ঞান বলে। অন্যদিকে মস্তিষ্কের কার্যকলাপের গবেষণাকে স্নায়ুবিজ্ঞান বলে। মস্তিষ্ককে অধ্যয়ন করার জন্য বেশ কিছু কৌশল অবলম্বন করা হয়। ঐতিহ্যগতভাবে অন্যান্য প্রাণীর জৈব নমুনায় প্রাপ্ত কলা ও কোষগুলি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করে অনেক তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক চিত্রণ প্রযুক্তি যেমন বৃত্তিমূলক স্নায়ুচিত্রণ এবং বৈদ্যুতিক মস্তিষ্কলেখচিত্র ধারণ মস্তিষ্কের অধ্যয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া মস্তিকে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের চিকিৎসা ইতিহাস অধ্যয়ন করে মস্তিষ্কের প্রতিটি অংশের কাজ বা বৃত্তি সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করা সম্ভব হয়েছে।